নিজের অজান্তেই মেয়ের মাংস খেল মা

খাসিয়া সম্প্রদায়ের মেয়ে লিকাই। খাসিয়ারা মাতৃতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করে। এখানে পুরুষরা ঘর আর বাচ্চা সামলান। আর নারীরা জীবিকার তাগিদে বাইরে কাজে যান। লিকাইয়ের কম বয়সেই বিয়ে হয়। এক কন্যা সন্তান জন্ম দেয় লিকাই। সুখেই চলছিল তার সংসার। তবে এক বর্ষায় সাপের ছোবলে মারা যায় লিকাইয়ের স্বামী।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে দুই বছরের শিশুকন্যাকে নিয়ে বিধবা হয় লিকাই। এরপর ছোট্ট মেয়েকে নিয়েই চলতে থাকে তার বেঁচে থাকার লড়াই। জীবিকার তাগিদে লিকাই বাইরে কাজ করতে যেত। মালবাহকের কাজ করত সে। জঙ্গলে মহাজনেরা কাঠ কাটার পাশাপাশি তা আবার মাথায় করে নিয়ে এসে রাস্তায় জমা করত লিকাই।



সবুজ ঘাসের কার্পেটে তুলি দিয়ে আঁকা মিষ্টি গ্রাম রংযাইরতেহ ছিল লিকাইয়ের বাস। গ্রামের পাশেই মায়াবী ঝরনার শব্দ শোনা যেন সবসময়। গাছের ডাল সরিয়ে লিকাই রোজ দেখত ঝরনাটিকে। সেসময় প্রতিবেশীর কাছে মেয়েকে রেখে কাজে যেত লিকাই। সারাক্ষণই তার মন পড়ে থাকত মেয়ের কাছে।

দিনের শেষ লিকাই সারাদিনের মজুরি নিয়ে দ্রুত গতিতে বাড়িতে ফিরত সে। মেয়েকে কোলে নিয়ে সে তার গাল চুমুতে ভরিয়ে দিত। সারাদিন পর মাকে পেয়ে আঁকড়ে ধরত মেয়েও। এমন করে দিন কেটে যেত, অভাগী মা আর মেয়ের। একসময় গ্রামেরই এক যুবক লিকাইয়ের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। রোজ ভোরে গ্রামের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত লিকাইয়ের জন্য।

লিকাইকে প্রেম নিবেদন করত। তবে জীবনের কাছে আঘাত পাওয়া লিকাই সাড়া দেয়নি। যুবকটি তাকে বোঝাত, তার একরত্তি মেয়ের বাবা দরকার, আর তারা দুজনে মিলে ভালোভাবে মানুষ করতে পারবে দুধের শিশুটিকে। লিকাইকে আর একা সব চাপ নিতে হবে না। যুবকটি তাকে নানান স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে।

ধীরে ধীরে লিকাই মানুষটিকে ভালোবেসে ফেলেছিল। কাজ তেমন কিছু করত না সে। মাঝে মাঝে জঙ্গলে পাখি, খরগোশ, সজারু, হরিণ শিকার করত। একদিন তারা বিয়ে করে ফেলে। যেহেতু খাসি সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। তাই সমাজের নিয়মে লিকাইয়ের নতুন স্বামী লিকাইয়ের বাড়িতে চলে এসেছিল। লিকাই কাজে যেত, ঘর আর মেয়ে সামলাতো তার দ্বিতীয় স্বামী। শিকারে যাওয়ার সময় লিকাইয়ের স্বামী প্রতিবেশীর বাড়িতে রেখে যেত ছোট্ট মেয়েটিকে।

সারাদিনের পরিশ্রম শেষে বাড়ি ফিরে, ক্লান্ত লিকাই সবার আগে কোলে তুলে নিত তার মেয়েটাকে। গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে পরম মমতায় তার গা মুছিয়ে দিত। চুল আঁচড়ে দিয়ে পরিষ্কার পোশাক পরিয়ে দিত। এই সময় মেয়েটিও এক মুহূর্ত মায়ের কাছ থেকে দূরে যেত না।

এদিকে লিকােই তার মেয়েকে বেশি সময় দেয় দেখে তার স্বামীর মনেও জমতে থাকে ক্ষোভ। তার সব রাগ গিয়ে পড়ছিল ছোট্ট মেয়েটির ওপরে। লিকাই বেরিয়ে গেলে বিনা কারণে অত্যাচার করত ওই একরত্তি মেয়েটির ওপর। কখনো খেতে দিত না আবার মারধোর করত। লিকাইয়ের নজরে পড়েছিল মেয়ের পরিবর্তন। দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিল তার মেয়েটি।


বাড়ি ফিরে লিকাই রোজ দেখত, মেয়েটির চোখ বেয়ে নামা জলের দাগ। স্বামীকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর পেত না। ছোট্ট মেয়েটিও হয়ত, আরো যন্ত্রণার ভয়ে মাকে কিছু বলত না। একদিন একটু আগেই কাজ থেকে বাড়ি ফিরেছিল লিকাই। খাসি পাহাড়ে সূর্য তখনো ডোবেনি। বাড়ি ফিরে লিকাই দেখেছিল তার স্বামী মাংস রান্না করে রেখেছে তার জন্য। লিকাই ফিরতেই থালা ভর্তি মাংস ধরিয়ে দিয়েছিল হাতে।

মেয়েকে তখনো আশেপাশে দেখতে পায়নি লিকাই। ভেবেছিল স্বামী রান্না করছিল, তাই হয়ত প্রতিবেশীর বাড়িতে মেয়েকে রেখে এসেছে। এই ভেবে লিকাই সারাদিনের পরিশ্রমে ক্ষুধার্ত হয়ে প্লেটের মাংস গোগ্রাসে খায়। লিকাইয়ের খাওয়া শেষ হওয়ার পর তার স্বামী নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

আয়েস করে রোজকার অভ্যাস মত পান সাজতে বসেছিল লিকাই। পানটা মুখে পুরেই মেয়েকে আনতে যাবে সে। জাঁতা দিয়ে সুপারি কাটতে গিয়ে পানের বাটার পাশে সে অদ্ভুত কিছু দেখতে পায়। তার পানের বাটার কাছেই পড়েছিল ছোট্ট একটি আঙ্গুল। মা চিনতে পেরেছিল তার মেয়ের আঙ্গুল। মুহূর্তের মধ্যে লিকাইয়ের চোখের সামনে কেঁপে উঠেছিল পৃথিবী।

লিকাই তার শিশুকন্যার মাংস খেয়েছে। ঈর্ষান্বিত স্বামী তার শিশুকন্যাকে মেরে লিকাইকে খাইয়েছে। লিকাইয়ের চিৎকার শুনে দৌড়ে এসেছিল গ্রামবাসীরা। পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্বামীকে খুঁজে বের করে মারধোর করতেই, নিজে মুখে সে স্বীকার করে কেবলমাত্র আক্রোশের বশেই মেয়েকে খুন করে হাড় ফেলে দেয় ওই ঝরনায়। প্রমাণ লোপাট করার সময় হয়ত শিশুটির একটি আঙ্গুল পড়ে গিয়েছিল ঘরের মধ্যে।

পাথর হয়ে গিয়েছিল লিকাই। তাকিয়ে ছিল ছোট্ট আঙ্গুলটির দিকে। তারপর হঠাৎই পাগলের মতো ঘর ছেড়ে জঙ্গলের পথে ছুটতে শুরু করে লিকাই। মা হয়ে মেয়েকে খেয়েছে লিকাই। এক রাক্ষুসীর অভিশপ্ত জীবন নিয়ে কীভাবে বাঁচবে সে।

“আসছি মা… আসছি এই বলে লিকাই দুহাত বাড়িয়েই ঝাঁপ দিয়েছিল ওই ঝরনার খাদে। সে মুহূর্তেই ১১১৫ ফুট নীচে পড়ে যায়। তখনো তার হাতে ধরা ছিল ছোট্ট আঙ্গুলটি। সত্যিই লিকাই পৌঁছে গিয়েছিল মেয়ের কাছে। আর কেউ কোনো দিন তাদের আলাদা করতে পারেনি। ঝরনা হয়ে গেছে লিকাই। তার নামেই ঝরনার নাম নোহকালিকাই। 

ঈর্ষার বলি হতে হয়েছিল ছোট্ট শিশুকে। মা মেয়ের স্বপ্ন আজ রংধনু হয়ে দেখা দেয় আকাশে। সেখানেই মা মেয়ে শান্তিতে আছে। কেউই তাদের মধ্যে বাঁধা হতে আসবে না। কেউই তাদের আলাদা করতে পারবে না। খাসিয়ারা এখনো মনে করে লিকাই আর তার ছোট্ট মেয়েটি এই ঝরনার মধ্যেই আছে।

সূত্র: খাসি লোকগাথা