ভয়াল রূপ নিয়েছে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান

ধাপে ধাপে প্রচন্ড শক্তি সঞ্চয় করে ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করেছে বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। পরিণত হয়েছে সুপার সাইক্লোনে। এর সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটারের বেশি হবে, যা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের শক্তির সমান। দেশের ইতিহাসে এ ধরনের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয়েছে মাত্র চারবার।



পূর্বাভাস অনুযায়ী, আম্ফান আজ মঙ্গলবার শেষরাত থেকে বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে দেশের উপকূল অতিক্রম করতে পারে। তাই নিচু ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আজ বিকাল থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া শুরু হবে বলে জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণসচিব শাহ কামাল। এরই মধ্যে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে দেখাতে বলা হয়েছে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত।

গতকাল সোমবার বিকালে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সুপার ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ২৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি সরাসরি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারে।

কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আজ (গতকাল) সারাদিন সমুদ্রেই প্রচুর শক্তি অর্জন করবে। এর মাধ্যমে এটি সুপার সাইক্লোনে পরিণত হবে। তখন ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের গতিবেগ হবে ঘণ্টায় ২২০ থেকে ২৬৫ কিলোমিটার। তবে উপকূলের কাছাকাছি আসতে আসতে এটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। তখন বাতাসের এই গতিবেগ কিছুটা কমে যেতে পারে।’

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্যাটাগরি-৪ মাত্রার চারটি ঘূর্ণিঝড় হয়, যা মূলত ২২০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতিবেগ নিয়ে আঘাত হানে। এর মধ্যে ২০০৭ সালে হওয়া ঘূর্ণিঝড় সিডরের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ২২৩ কিলোমিটার। ১৯৯১ সালে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ২২৫ কিলোমিটার ছিল। ১৯৯৪ সালে হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের ২২০ কিলোমিটার এবং ১৯৯৭ সালে সীতাকুন্ডের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ছিল ২৩২ কিলোমিটার। এর আগে শুধু ১৯৭০ সালে ২২৪ কিলোমিটার গতিবেগ নিয়ে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ভোলা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভয়াবহতার দিক থেকে ওইসব ঘূর্ণিঝড়ের মতোই হবে আম্ফান। তবে প্রস্তুতি ও সচেতনতা থাকায় হতাহত কম হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, দক্ষিণ-পূর্ব ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফান উত্তর দিকে অগ্রসর ও ঘনীভূত হয়ে বর্তমানে পশ্চিম-মধ্য ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করছে। বাংলাদেশের মতো ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের গতিপথে চোখ রাখছে ভারতও। ঘূর্ণিঝড়টি গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছিল।

স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত করেছে জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণসচিব বলেন, কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে এই ঘূর্ণিঝড়ের বিপদ আসায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে রাখার ব্যবস্থা করা হবে। একেকটি পরিবারের সদস্যরা যাতে একসাথে থাকতে পারে সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রথমে গর্ভবতী নারী, প্রতিবন্ধী ও শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হবে। এর পর নেওয়া হবে অন্যদের। ইফতারের পর থেকে পুরুষদের নেওয়া হবে। তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের পাঁচ হাজার আশ্রয়কেন্দ্রে ২১ লাখের মতো মানুষকে রাখা যায়। এখন আমরা ওইসব এলাকার সবগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে নিয়েছি। ফলে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে রাখতে কোনো সমস্যা হবে না।

এদিকে মাঠে পেকে যাওয়া বোরো ধান যাতে ঝড়বৃষ্টিতে নষ্ট না হয়, সেজন্য দুর্যোগ শুরুর আগেই তা কেটে কৃষকের ঘরে তুলতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় মাঠে থাকা ধান কেটে কৃষকের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জোর চেষ্টা চলছে বলে জানান কর্মকর্তারা। আম্ফান মোকাবিলায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম। ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন তারা।

আউটারে কাজ বন্ধ, এলার্ট-৩ চট্টগ্রাম বন্দরে : ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে ৬ নম্বর সংকেত দেওয়ায় অভ্যন্তরীণ এলার্ট-৩ জারি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে জেটিতে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামা ও খালাস স্বাভাবিক রয়েছে। প্রাকপ্রস্তুতি হিসেবে আউটারে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ এবং জেটি থেকে দুটি জাহাজ বহির্নোঙরে পাঠানো হয়েছে। আজ মঙ্গলবারের মধ্যে জেটির সব জাহাজ বহির্নোঙরে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবে। সংকেত বাড়লে জেটিতেও কাজ বন্ধ করে যন্ত্রপাতি গুটিয়ে রাখা হবে। আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো থেকে পাঠানো সংবাদে এ তথ্য জানা যায়।

জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কোনো ধরনের লাইটার জাহাজ পণ্য খালাস করতে যাচ্ছে না। এসব লাইটারকে কর্ণফুলী নদীর উজানে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। যেসব লাইটারে পণ্য বোঝাই হয়েছে, সেগুলো নিরাপদ আশ্রয়ে আসছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এসব লাইটার কর্ণফুলী নদীতে অবস্থান করবে। চট্টগ্রাম বন্দর সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম আমাদের সময়কে বলেন, আউটারে থাকা জাহাজগুলোকে গভীর সমুদ্রে যেতে বলা হয়েছে। আজকের মধ্যে জেটির জাহাজগুলো বহির্নোঙরে পাঠানো হবে।

গতকাল সোমবার জেটি থেকে দুটি জাহাজ গভীর সমুদ্রে পাঠানো হয়েছে। তবে জেটিতে এখনো কাজ চলছে। পণ্য খালাসও স্বাভাবিক আছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বন্দর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। কুতুবদিয়া, সেন্টমার্টিন, কক্সবাজারসহ গভীর সমুদ্রে শতাধিক জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজকে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নিয়ে সার্বক্ষণিক ইঞ্জিন সচল রাখতে বলা হয়েছে। সংকেত বাড়ায় ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গতকাল ‘অ্যালার্ট-৩’ জারি করা হয়।

বন্দর সচিব ওমর ফারুক জানান, বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ হলেও জেটিতে ১৭টি জাহাজে পুরোদমে কাজ চলছে। এর মধ্যে ১১টি কনটেইনার জাহাজও রয়েছে। বন্দর চ্যানেলে অবস্থানরত অভ্যন্তরীণ জাহাজ ও নৌযানগুলোকে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুর উজানে সরিয়ে দিচ্ছে কোস্টগার্ড।