প্রসব বেদনা নিয়ে ৯ ঘণ্টা ছুটলেন অন্তঃসত্ত্বা, ফিরিয়ে দিল ৩ হাসপাতাল

চিকিৎসক সন্তান জন্মদানের তারিখ দিয়েছিলেন আগামী ৩ মে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রসব বেদনায় কাতর হয়ে পড়েন তিনি। উপায় না দেখে ভর্তির জন্য হাসপাতালে ছুটে যান অন্তঃসত্ত্বা এক তরুণী। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত টানা ৯ ঘণ্টা ছুটেছেন তিন হাসপাতাল। কিন্তু কোনো হাসপাতালে তার ঠাঁই হয়নি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে ঘটেছে এমন ঘটনা।



অন্তঃসত্ত্বা ওই তরুণীর নাম তানিয়া (২০)। তার সঙ্গে ছিলেন স্বামী শিপন। তিনি পেশায় প্রাইভেটকার চালক, ধানমন্ডিতে থাকেন। আর সঙ্গের মধ্যবয়সী নারী তাদের ফুফু।

শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (এমসিএইচটিআই) ভেতর থেকে মধ্যবয়সী এক নারীর কাঁধে ভর দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে আসছিলেন অন্তঃসত্ত্বা ওই তরুণী। আর একটি ব্যাগ হাতে পিছু পিছু আসছিলেন তার স্বামী শিপন।

জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিপন জানান, ‘আগামী ৩ মে তানিয়ার সন্তান জন্মদানের (ডেলিভারি) তারিখ দিয়েছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু শুক্রবার সকাল ৯টায় তানিয়ার প্রসব বেদনা শুরু হয়। পানি ভাঙতে শুরু করায় (অ্যামনিওটিক মেমব্রেন রাপচার) তিনি তার ফুফুকে সঙ্গে নিয়ে মোহাম্মদপুরের সরকারি মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে টিকিট কেটে ডাক্তার দেখাতে যান।’


দু’মাস আগে সেখানেই তানিয়ার ডেলিভারি ও চেকআপের জন্য কার্ড করে রাখা হয়েছিল জানিয়ে শিপন বলেন, কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে সেখানে ডেলিভারি সেবা আপাতত বন্ধ রয়েছে বলে তাদের বিদায় করে দেওয়া হয়।

পরে তানিয়াকে প্রসব বেদনায় কাতরাতে দেখে ইস্কাটনের বেসরকারি আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছুটে যান। কিন্তু সেখানে টিকিট কেটে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা কাগজপত্র দেখে জানান, তানিয়ার শরীরে জ্বর রয়েছে। সুতরাং তারা সন্দেহ করছেন যে, তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। সেজন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া তারা কিছুতেই ভর্তি করবেন না তানিয়াকে, যোগ করেন তরুণীর স্বামী।

শিপন আরও বলেন, এ সময় তিনি ও তার ফুফু চিকিৎসকদের প্রয়োজনে করোনা টেস্ট করে ভর্তি করানোর জন্য বারবার অনুরোধ জানালেও তারা গ্রহণ করবেন না বলে জানিয়ে দেন। পরে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় হাসপাতালের এক নিরাপত্তারক্ষী তাদের পরামর্শ দেন, আজিমপুর মাতৃসদনে গেলে সন্তান ডেলিভারি করাতে পারবেন তানিয়ার।

ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। তারা সেখান থেকে ছুটে আসেন আজিমপুর মাতৃসদনে। কিন্তু এখানকার জরুরি বিভাগ টিকিট পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। কর্তব্যরত চিকিৎসক সাফ জানিয়ে দেন, যেখানে কার্ড করেছিলেন সেখানে যান। করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা কিছুতেই তানিয়াকে ভর্তি নেবেন না এবং অপারেশন করবেন না, বলেন তরুণীর স্বামী।

যন্ত্রণায় কাতর তানিয়া তখন স্বামীকে বলছিলেন, তার পেট কেমন শক্ত হয়ে যাচ্ছে। তার খুব খারাপ লাগছে। এ সময় স্বামীর দিকে তাকিয়ে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি বোধহয় আর বাঁচুম না।’

স্ত্রীর এই কষ্টে যেন আরও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শিপন। অনেকটা বিপর্যস্ত চেহারায় তিনি স্ত্রী ও ফুফুকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে ছুটে যান।