করোনা সংকট দুধ, ডিম, মাছ, মাংসে বিপদ আসছে


প্রথম আলো প্রতিবেদন থেকে পড়ুন  করোনা সংকট দুধ, ডিম, মাছ, মাংসে বিপদ আসছে ! (কি কি বিপদ আসছে ভিডিওতে দেখুন)

বাজারে ১০০ টাকায় এক কেজি ব্রয়লার মুরগি পাওয়া যাচ্ছে। ফার্মের ডিমের হালিও ২৫ টাকায় নেমে এসেছে। এই হিসাব সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি)। আর গ্রামে তো দুধ পানির চেয়েও সস্তায় মিলছে।

এদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে করোনা মোকাবিলায় এসব প্রাণিজ আমিষ খাওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ফলে, ভোক্তা হিসেবে এই খাদ্যের দাম কমে আসা নিঃসন্দেহে খুশির খবর।

(কি কি বিপদ আসছে ভিডিওতে দেখুন)
 
অন্য দিকটি হলো মুরগি, ডিম ও দুধের দামের এই সুখবরের পেছনে বড় বিপদ ধেয়ে আসছে। করোনা সংকটের কারণে গত দুই সপ্তাহে এসব খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে, যার প্রাথমিক প্রভাব হিসেবে এসব পণ্যের দাম কমছে। কারণ, উৎপাদনের তুলনায় ভোগ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। তবে আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে পাইকারি বাজারে মুরগি আর ডিমের দামে উল্টো চিত্র দেখা যেতে পারে বলে এসব খাতের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন।

দেশের গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বেশি অর্থায়নকারী সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) থেকে পোলট্রি ও ডেইরি খাতে করোনাভাইরাসের প্রভাব নিয়ে একটি প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে পোলট্রি খামারগুলো বিক্রি না হওয়ায় এক দিনের লাখ লাখ বাচ্চা মাটিতে পুঁতে ফেলছে। ডিম ফেলে দিচ্ছে। এই খাতে প্রতিদিন নয় কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। একদিকে লকডাউনের কারণে ভোক্তারা এসব খাদ্য কিনতে পারছে না, অন্যদিকে উদ্যোক্তারা বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দিচ্ছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, দেশে বছরে ৯৯ লাখ টন তরল দুধের দরকার হয়, যার ৭০ শতাংশ দেশের খামারগুলোয় উৎপাদিত হয়। বাকিটুকু আমদানি করে চাহিদা মেটানো হয়। বর্তমানে দেশে দিনে ১২০ থেকে ১৪০ লাখ লিটার তরল দুধ উৎপাদিত হচ্ছে, যার বেশির ভাগই বিক্রি হচ্ছে না। খামারিরা এসব দুধ বিক্রি করে গরুর খাবার ও নিজেদের বাজার করে থাকেন। তাই বিক্রি না হওয়ায় গরু ও খামারি উভয়েই বিপদে পড়েছেন।

দেশের মৎস্য খাত নিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, সাধারণত এপ্রিল মাসে দেশের মাছের ঘের ও পুকুরগুলোয় পোনা এনে রাখা হয়। মে থেকে বৃষ্টি শুরু হলে মাছগুলো বড় হতে থাকে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে বেশির ভাগ মাছের খামারি পোনা সংগ্রহ এবং তা পুকুরে ছাড়তে পারছেন না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে তা মাছের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী স ম রেজাউল করিম বলেন, মাঠপর্যায়ে মুরগির বাচ্চা পুঁতে ফেলা এবং দুধ ফেলে দেওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। তিনি আরও বলেন, যা ক্ষতি হওয়ার তা তো হয়েই চলেছে। এত বড় বিপদ যে আসবে, তা তো আগে থেকে আঁচ করা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশকেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী করোনা সংকট মোকাবিলায় যে আর্থিক প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন, তা থেকে এই খাতের উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়া হবে। মন্ত্রী খামারিদের খামার বন্ধ না করে যেভাবে হোক চালু রাখার পরামর্শ দেন।

বিপদ বড় হচ্ছে

দেশে প্রতি সপ্তাহে ১ কোটি ৩০ লাখ মুরগির বাচ্চা তৈরি হয়। একেকটি বাচ্চা উৎপাদনে গড়ে খরচ ১৫ থেকে ২০ টাকা। এক সপ্তাহ ধরে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একেকটি বাচ্চা দুই থেকে চার টাকায় বিক্রি করছে। তাও ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে না। ফলে সপ্তাহে কমপক্ষে এক কোটি মুরগির বাচ্চা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশের পোলট্রি খাতের কেন্দ্রীয় সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি)।

মুরগির বাচ্চা সাধারণত ছোট খামারিরা কিনে নিয়ে যান। সেগুলো বড় করে বাজারে বিক্রি করেন। কিন্তু এক বছর ধরে মুরগির দাম ধারাবাহিকভাবে কমছে। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর তা আরও কমতে শুরু করেছে। টিসিবির হিসাবে গত এক সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ, আর এক বছরে কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এক কেজি মুরগি উৎপাদনে খামারিদের ৯০ থেকে ৯৫ টাকা খরচ ও পরিবহন খরচ যোগ করলে তা ১২০ টাকা পড়ে। কিন্তু বাজারে করোনার প্রভাবে খামার থেকে মুরগি বড় শহরে কম যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে বিপিআইসিসির প্রেসিডেন্ট মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একদিকে তো আমরা মুরগির বাচ্চা বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দিচ্ছি, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের খাবার পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। অনেক স্থানে চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের এই শিল্প শেষ হয়ে যাবে।’

বিপিআইসিসির প্রাথমিক হিসাবে গত এক মাসে পোলট্রি খাতে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। এই খাতের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৬৫ হাজার খামারির বেশির ভাগই তরুণ ও দেশীয় উদ্যোক্তা। মুরগি পালন থেকে শুরু করে বড় করা, ওষুধ, খাবার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ফ্রাই করে বিক্রি করার কারখানাগুলোর বেশির ভাগই গত দুই যুগে বেড়ে উঠেছে। এসব খামারে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। এফএওর হিসাবে চলতি বছরই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ডিম খাওয়ার দিক থেকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছেছে। ওই মান অনুযায়ী বছরে একজন মানুষের ১০৪টি ডিম খাওয়ার কথা। বাংলাদেশের মানুষ এ বছরই গড়ে ওই পরিমাণে ডিম খাওয়া শুরু করেছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সম্মানিত ফেলো এম আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, করোনা সংকটের কারণে মুরগি ও ডিম উৎপাদনে যে ধস নেমেছে, তা যেভাবেই হোক ঠেকাতে হবে। মানুষকে বেশি করে ডিম, দুধ ও মুরগি খাওয়ার জন্য প্রচার চালাতে হবে। করোনার কারণে লকডাউন হওয়া এলাকায় সরকারি-বেসরকারি সহায়তা বা ত্রাণ কর্মসূচিতে এসব পুষ্টিকর খাবার দেওয়া যেতে পারে।

শুকাচ্ছে গরু, পানিতে ফেলা হচ্ছে দুধ

মুরগির মতো গবাদিপশুর খামারিরাও কম বিপদে নেই। দেশের গরু-ছাগলের ৭০ হাজার খামারে প্রতিদিন ১ কোটি ২০ লাখ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়ে থাকে, যার মধ্যে ৭০ শতাংশ দুধ বিভিন্ন মিষ্টির দোকান, আইসক্রিম কারখানা, কনফেকশনারি ও বাসাবাড়িতে বিক্রি হতো। বাকি দুধ কিনে নিত মিল্ক ভিটাসহ পাস্তুরিত তরল দুধ উৎপাদনকারী আটটি বড় প্রতিষ্ঠান।

করোনার এই সংকটে বেশির ভাগ মিষ্টির দোকান, রেস্তোরাঁ ও কনফেকশনারি বন্ধ। বাসাবাড়িতেও বেশির ভাগ ক্রেতা দুধ নিচ্ছেন না। অন্যদিকে, মিল্ক ভিটাছাড়া বেশির ভাগ কোম্পানি দুধ কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে, খামারিদের উৎপাদিত তরল দুধের প্রায় ৯০ শতাংশ ফেলে দিতে হচ্ছে।

এসব তরল দুধ বিক্রি না হওয়ায় খামারিরা নিজেরা আর্থিকভাবে বিপদে পড়েছেন। তাঁরা গরুকেও ঠিকমতো খাবার কিনে দিতে পারছেন না। এ কারণে এসব গরু দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ডেইরি ফারমারস অ্যাসোসিয়েশন। বাজারে গো–খাদ্যেরও সংকট দেখা দিয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ডেইরি ফারমারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ ইমরান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে প্রতিবছর ২০ হাজার কোটি টাকার গুঁড়া দুধ আমদানি হয়। তরল দুধ বিক্রয়কারী কোম্পানিগুলো যদি দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে তরল দুধকে গুঁড়া দুধে পরিণত করা শুরু করে, তাহলে খামারিরা কিছুটা হলেও বিপদ থেকে বাঁচেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পিকেএসএফের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মাছ, মুরগি ও গবাদিপশুর জন্য প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। মূলত, চীন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব ওষুধ আসে। বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সেসব ওষুধ ও কাঁচামালেরও কয়েক মাসের মধ্যে সংকট দেখা দিতে পারে। এ কারণে এখন থেকে তা দ্রুত আমদানির ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।