Sponsored

করোনায় যেভাবে মৃত্যুহার কমিয়ে আনল জার্মানি

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আছে ইউরোপ। করোনার উৎসভূমি চীনের চেয়ে নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে ইউরোপের তিন দেশ— ইতালি, জার্মানি ও স্পেনে। এই তিনদেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে ইতালি। আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে কম হলেও মৃতের সংখ্যায় তারা চীনকে ছাড়িয়ে গেছে। এরপরের অবস্থানে রয়েছে স্পেন ও জার্মানি। তবে এই তিন দেশের মধ্যে আনুপাতিক হারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে জার্মানি।



এই লেখা যখন লিখছি তখন জার্মানিতে ২৪ হাজার আটশ ৭৩ জন আক্রান্তের বিপরীতে মৃতের সংখ্য মাত্র ৯৪ জন। অন্যদিকে স্পেনে ২৮ হাজার সাতশ ৬২ জনের বিপরীতে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার সাতশ ৭৩ জন। আক্রান্তের সংখ্যায় স্পেনের কাছাকাছি হয়েও কীভাবে জার্মানি মৃতের সংখ্যা এত কমিয়ে এনেছে তা নিয়ে বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান। তারা মোটাদাগে জার্মানির ৪টি প্রতিরোধী ব্যবস্থার ওপর আলোকপাত করেছে।


সম্মিলিত প্রচেষ্টা
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম জার্মানির উত্তর রাইন-ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যে পাঁচ ব্যক্তির করোনাভাইরাসে আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়। এরপর নড়েচড়ে বসে জার্মান সরকার। জার্মানির সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। করোনাভাইরাসের মহামারি ঠেকাতে একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় জার্মানির স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরসঙ্গে যোগ দেয় জার্মানির সংক্রমণ রোগ বিষয়ের গবেষণা কেন্দ্র রবার্ট কক ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদল। সেই থেকে অদ্যবদি তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে।

অবহিতকরণ
শুরু থেকেই জার্মান সরকার করোনা ভাইরাসের বিস্তার ও ভয়াবহতা নিয়ে জনগণকে অবহিত করছে। মিডিয়াকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে তারা জনগণকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের উপায় বাতলে দিচ্ছে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেল,স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইয়েন স্পান, জার্মানির সংক্রমণ রোগ বিষয়ের গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান লুথার ভিলার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে, নাগরিকদের সতর্ক করছেন এবং সেই সঙ্গে আতঙ্কিত না হয়ে সবার করণীয় বিষয়গুলো অবহিত করছেন।

পরীক্ষা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বেশি বেশি পরীক্ষা করার ওপর জোর দিচ্ছে। কারণ যতবেশি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগী শনাক্ত করা যাবে ততবেশি তাদেরকে সুস্থ লোকের থেকে আলাদা করা যাবে। এতে করে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে। জার্মানি প্রথম থেকেই করোনা রোগী শনাক্তকরণের জন্য পরীক্ষা কার্যক্রমের ওপর জোর দিয়েছে। জার্মানির জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমানে প্রতিদিন ১২ হাজার লোককে পরীক্ষা করার ক্ষমতা আছে। তারা চাইলে এই সক্ষমতা বাড়িয়ে সপ্তাহে ১ লাখ ৬০ হাজার করতে পারবে। এই সক্ষমতার ফলে তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্তের প্রকৃত চিত্র বের করতে পেরেছে। ফলে তারা নতুন করে সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পেরেছে এবং ব্যাপক মৃত্যুর হার এড়াতে পারছে। কতটা পেরেছে তা একটি তুলনামূলক পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাবে। ইতালি ও যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার ৯ ও সাড়ে ৪ শতাংশ হলেও জার্মানিতে এই হার মাত্র শূন্য দশিমক ৩ শতাংশ।

লকডাউন

জার্মানির ১৬টি রাজ্যে মোটামুটি জরুরি অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সীমান্ত আংশিকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। কোনো কোনো শহর এখনও লকডাউন করা না হলেও মোটামুটি নাগরিকদের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি খারাপ হলে যেকোনো সময় আক্রান্ত শহরগুলো লকডাউন করা হতে পারে।  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিনোদন কেন্দ্র, খেলাধুলা বন্ধ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে সভা সমাবেশ ও লোক সমাগম। এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দোকানপাট, ওষুধের দোকান, পেট্রল পাম্প, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, সরকারি পরিসেবাসমূহ ছাড়া সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ করা হয়েছে। সকল অবকাশযাপন কেন্দ্র ও ভ্রমণ আপাতত বন্ধ করা হয়েছে।

বিশ্বের সেরা চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবার দেশগুলোর একটি জার্মানি। করোনাভাইরাসের প্রকোপে এখনও তাদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়নি। তবে জার্মানি কতদিন এই লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারে সেটাই দেখার বিষয়।