Sponsored

এবার কূপ খনন শিখতে ১৬ কর্মকর্তা যাচ্ছেন ইউরোপ

পুকুর খনন শিখতে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ  ১৬ কর্মকর্তাকে ইউরোপ পাঠানোর প্রক্রিয়া আগেই চূড়ান্ত করেছে। এরপর কূপ খনন শিখতে অন্য আরেকটি প্রকল্পের আওতায় আরও ১৬ কর্মকর্তাকে ইউরোপ বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় একটি দেশে পাঠানো হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ৫০টি পাতকুয়া বা কূপ খনন করতে ব্যয় হবে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এ হিসাবে প্রতিটিতে ব্যয় হবে সাড়ে ৫ লাখ টাকা। আর ১৬ কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এ হিসাবে জনপ্রতি পাবেন ৮ লাখ টাকা। এ টাকা দিয়ে তারা অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসসহ যেকোনো একটি দেশ ভ্রমণ করবেন। এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প ইতিমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে। বিএমডিএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো কিছুই প্রশিক্ষণ ছাড়া সম্ভব না। কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ নিলে অনেক কিছু জানতে পারে। ইন্টারনেট থেকে অনেক কিছু জানা যায়, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা নিতে সরেজমিন যেতে হয়।



বিএমডিএ সূত্রে জানা গেছে, মোট ১৭৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে নাটোর জেলায় সেচ সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এসব কর্মকর্তা বিদেশ যাবেন। প্রকল্পটি গত আগস্টে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। মূলত বরেন্দ্র অঞ্চলে যেসব ফসলের জন্য স্বল্প পানির প্রয়োজন হয়, সেসব ফসলের ক্ষেতে প্রকল্পের আওতায় সেচ দেওয়া হবে। যদিও বিএমডিএর মূল কাজ এটি নয়। কিন্তু ‘ক্ষুদ্র সেচের’ কার্যক্রম পরিচালনায় এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

এর আগে সরকারি কর্মকর্তাদের মাত্রাতিরিক্ত বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপরও বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় বিদেশ ভ্রমণের ঝোঁক কমছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্প মানেই বিদেশ ভ্রমণ, এটা এক ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা শুরু হয়েছে। যদিও এই বিদেশ ভ্রমণে কী জ্ঞান অর্জিত হলো তা মূল্যায়নের তেমন সুযোগ নেই। ফলে কূপ খনন শিখতে বিদেশ গিয়ে কতটা সুফল মিলবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমডিএর রাজশাহীর প্রধান কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক সুমন্ত কুমার বসাক গত বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা বিশেষ ধরনের কূপ, তাই একটু খরচ বেশি। তবে এটা বাস্তবসম্মত। এই কূপ খননের অভিজ্ঞতা নিতে বিদেশ ভ্রমণ করাও জরুরি। কারণ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন না করলে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে কী করে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্বের কোন কোন দেশে ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার হয়, আমার জানা নেই। তবে এগুলো ইন্টারনেট থেকে যে কেউ জানতে পারে। ইন্টারনেটে স্টাডি করে সব কিছুই শেখা ও জানা যায়। কিন্তু প্র্যাকটিকাল (বাস্তব) জ্ঞান অর্জনে সরেজমিন যেতে হয়।


প্রকল্পটি ২০১৯ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বাস্তবায়ন হবে। প্রকল্পের আওতায় ৮ জন করে দুটি ব্যাচে ১৬ কর্মকর্তা বিদেশ ভ্রমণ করবেন। প্রতিটি ধাপের আটজনের মধ্যে চারজন বিএমডিএর প্রকৌশলী এবং বাকি চারজন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা থাকবেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমডিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্ষায় বৃষ্টির পানি ধরে রেখে শীতকালে এর ব্যবহার সংক্রান্ত আরও প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এতে সফলতাও এসেছে। এগুলো সরেজমিনে আসলে দেখা যাবে। তবে কূপ খনন বা বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি আমার এ মুহূর্তে মনে নেই। তাই এ বিষয়ে বলতে পারব না।

প্রকল্পটি নাটোর জেলার সাতটি উপজেলানাটোর সদর, নলডাংগা, বাগাতিপাড়া, সিংড়া, বড়াইগ্রাম, লালপুর ও গুরুদাসপুর অঞ্চলে বাস্তবায়ন হবে। যদিও এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়নে আলাদা প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় এসব অঞ্চলে ২ কোটি টাকা খরচ করে গাছ লাগানো হবে।

কূপ খননের অভিজ্ঞতা নিতে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ও সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এত টাকা খরচ করে কূপ খননের অভিজ্ঞতা নিতে বিদেশে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। এর আগেও পুকুর খননের অভিজ্ঞতা নিতে বিদেশ যাওয়ার কথা শোনা গিয়েছিল, এগুলো সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়।

প্রকল্পের আওতায় অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। ৯৫ লাখ টাকা খরচ করে প্রকল্প পরিচালকের জন্য একটি জিপ গাড়ি কেনা হবে। এছাড়া আরও ১০ লাখ টাকা খরচ করে ৪টি যানবাহন কেনা হবে। এসব গাড়ি চালানোর জন্য তেল ও জ্বালানি বাবদ ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া মুদ্রণ ও প্রকাশনায় ৯ লাখ টাকা, স্টেশনারি-সিল ও স্ট্যাম্প বাবদ ৭ লাখ টাকা, প্রচার ও বিজ্ঞাপন বাবদ ১০ লাখ টাকা, আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে তিনজন কর্মকর্তার জন্য ৬৯ লাখ টাকা ও ৬০০ কৃষকের প্রশিক্ষণ বাবদ সাড়ে ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিএমডিএর ‘পুকুর পুনঃখনন ও ভূ-উপরিস্থ পানি উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুদ্র সেচে ব্যবহার’ শীর্ষক আরেকটি প্রকল্পের আওতায় ১৬ কর্মকর্তা বিদেশ সফর করবেন। এ জন্য ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয় হবে। বরেন্দ্র অঞ্চলে অনেক পুরনো যেসব পুকুর স্থানীয় লোকজন সেচের কাজে ব্যবহার করতেন, সেগুলো পুনঃখনন করা হবে। কর্মকর্তারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা নিতে বিদেশ যাবেন। গত ২৭ আগস্ট একনেক সভায় এই প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এতে শুধু পুকুর খননের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৬ কোটি টাকা। পুকুরের ধারে গাছ লাগাতে দুই কোটি টাকা খরচ করা হবে।