Sponsored

মাজারে হিন্দুরাই বেশি আসত, তবুও পোড়ালো

দিল্লিতে সহিংসতার ঘটনায় এখনো হিসেব মেলাতে পারছেন না বৃদ্ধ মিনাজউদ্দিন। দিল্লির করওয়াল নগরের মোড়েই বড় রাস্তার ওপর চাঁদ বাবার মাজার। গত ২৫-৩০ বছর সেই মাজারের দেখভাল করছেন মিনাজ।




মিনাজ বলেন, কী বলব বলুন তো! কারা করেছে জানি না। এখানে যারা আসে, তাদের ৮০ শতাংশই হিন্দু। পরীক্ষায় ভালো ফলের আশায় শিক্ষার্থী থেকে বিয়ে করতে যাওয়া বর— এখানে মাথা ঠেকাবেই সক্কলে। তার পর সব শুভ কাজ।

সেই চাঁদ বাবার মাজার পুড়ে ঝামা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাঁচ ফুট দূরে নীরব দর্শক দিল্লি পুলিশের চৌকি বসেছে। তিন দশকের সম্প্রীতি গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে সোমবার বিকেলে, মাত্র দশ মিনিটের তাণ্ডবে।

মিনাজ বলেন, একদল লোক রে রে করে দৌড়ে এল। অচেনা মুখ। পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো মাজারের বাইরে। ভেতরে ফেলে দেওয়া হলো জ্বলন্ত টায়ার। কোনো মতে দৌড়ে প্রাণ বাঁচান মিনাজ। ভেঙে গেছে মাজারের দরজার একাংশ। জ্বলন্ত টায়ারের আগুনে ঘর পুড়ে ঝামা হয়ে গেছে। আগুনের তাপে বেঁকে গেছে সিলিং ফ্যান।

করওয়াল নগরে ঢুকতেই এক পাশে আজাদ চিকেন সেন্টার। বুরে খান, দীন মুহাম্মদরা চার ভাই মিলে দোকান চালান। পেট্রল বোমায় পুড়ে গেছে সারা বাড়ি। নীচের দরজা বন্ধ থাকায় চার ভাইয়ের ১৮ জনের পরিবার ছাদ ডিঙিয়ে প্রাণ বাঁচায়। আজাদ চিকেন সেন্টার ঝলসে গেলেও উল্টো দিকে ভুজিয়াওয়ালার দোকান অক্ষত রয়েছে। আগুন তো দূরের কথা, গন্ডগোলের আঁচটুকু পড়েনি সেই দোকানে।

সে ব্যাপারে কেউ কিছু বলতে চান না। ভিড় দেখলেই খেঁকিয়ে উঠছেন আধাসেনারা। দ্রুত লাঠি তুলে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হচ্ছে। ধমকে ফের বাড়ির ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে মানুষকে।

করওয়াল নগর ধরে চাঁদ বাগের দিকে যত এগিয়েছেন সাংবাদিকরা। তারা দেখেছেন, বেছে বেছে কিছু দোকান ও বাড়ি ছুঁয়ে গিয়েছে আগুনের দৌরাত্ম্য। যেমন পাপ্পু কুলারওয়ালা। দোতলা বাড়ির উপরের তলায় হিন্দুদের দোকান— তাই পাপ্পুর দোকান বেঁচেছে। কিন্তু কুলারগুলোকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে অগ্নিকুণ্ডে।

চার দশকের বাসিন্দা, পক্ককেশ নাদিম অবশ্য রাখঢাক না-রেখে বলেন, বাইরে থেকে লোক ঢুকেছিল। স্থানীয়রা সেই বাইরের লোকদের আমাদের ঘর-দোকান চিনিয়ে দিয়েছে।

চাঁদ বাগ হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এটা যেমন সত্য, কয়েকশ মিটার এগোলেই চমন পার্কে ঠিক উল্টো ছবি। মুস্তাফাবাদের বাসিন্দা সুনীতা শর্মার কথায়, হিন্দুদের স্কুল জ্বলছে। আর পাশে মুসলমানদের স্কুল অক্ষত। কেমন করে হয়? সোমবার ঝামেলার দিন মুসলিম স্কুলটি বেলা ১১টায় ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। হিন্দু স্কুলে তখন ক্লাস চলছে। আসলে সব খবর ছিল ওদের কাছে।

নাদিম যেখানে বসে কথা বলছিলেন, তার উল্টো দিকেই আম আদমি পার্টির কাউন্সিলর তাহির হোসেনের চারতলা বাড়ি। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আর্বজনায় ভর্তি নালা। ওই নালা থেকেই উদ্ধার হয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর কর্মকর্তা অঙ্কিত শর্মার ক্ষতবিক্ষত দেহ।

যাকে হত্যার অভিযোগে তাহিরের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছে দিল্লি পুলিশ। নাদিমদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হচ্ছে তাহিরকে। গোষ্ঠী সংঘর্ষের পুরো দায় এখন তাহিরের ওপর চাপানো হচ্ছে। আসলে দোষী বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র।

দু’টি বাড়ি দূরেই দাঁড়িয়ে থাকা নিশান গুজ্জর সব দাবি উড়িয়ে পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, তাহলে তাহিরের বাড়ির ছাদ থেকে আমাদের লক্ষ্য করে পেট্রল বোমা, অ্যাসিড, গুলতি দিয়ে ইট-পেরেক কারা নিক্ষেপ করছিল?

চার দিনে অনেক কিছুই বদলে গেছে। পারস্পরিক সন্দেহ, আতঙ্ক আর অবিশ্বাস ভর করেছে। আজ শিব বিহার হয়ে নালা টপকে মুস্তাফাবাদে ঢোকার সময়ে আগ বাড়িয়ে সতর্ক করে দেওয়া চেহারাগুলো সাংবাদিকদের বলেছিল, সব শান্ত, কিন্তু সাবধানে যাবেন।